মুক্তিযুদ্ধে দ্বিতীয় বৃহত্তম গেরিলা বাহিনী “পলাশডাঙ্গা যুব শিবির” এর অবদান

0
2752

Untitled-02 - Copy

দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ, ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত, দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে পাওয়া লাল সবুজের এই বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে যুদ্ধপরিচালনা করা হয়। পাশাপাশি গড়ে ওঠে বিভিন্ন বেসামরিক গেরিলা বাহিনী। যাদের যুদ্ধ ক্ষমতা, রণকৌশল, নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠার দিক থেকে মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদান  রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম গেরিলা বাহিনী হচ্ছে “পলাশডাঙ্গা যুব শিবির”।”উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা বাহিনী” সিরাজগঞ্জের “পলাশডাঙ্গা যুব শিবির”।

১৯৭১ সালের ৩মে সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলার মধ্যভদ্রঘাট গ্রামে অাব্দুল লতিফ মির্জার নেতৃত্বে হারান মাষ্টারের বাড়িতে গড়ে ওঠে “পলাশডাঙ্গা যুব শিবির”। স্বাধিনতাকামী বুদ্ধিজীবি, রাজনীতিবিদ,  বিদ্রোহী সেনা, ইপিআর, আনসার, ছাত্র, সাধারণ জনতা এই শিবিরের সদস্য। প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন মাত্র ২৩ জন, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য সদস্য হলেন আব্দুল আজিজ সরকার, বিমল কুমার দাস, সোহরাব আলী সরকার, লুৎফর রহমান, শফিকুল ইসলাম শফি প্রমুখ। ভদ্রঘাট গ্রাম শহর থেকে দুরবর্তী হওয়ায় এ গ্রাম মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ছিল নিরাপদ। মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্প হিসাবে ব্যবহার করত হারান মাষ্টারের ২৪ হাত একটি টিনের ঘর। তাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করত গ্রামের মানুষ।

পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের অপারেশন এরিয়া ছিল সিরাজগঞ্জ জেলার দক্ষিণাংশ, পাবনার ফরিদপুর, সাথিয়া, চাটমোহর, বগুড়ার শেরপুরসহ নাটোরের গুরুদাসপুর পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় এদের মাত্র ৮টি ৩ নট ৩ রাইফেল অস্ত্র ছিল।  পরবর্তীতে তাদের অস্ত্রের উৎস ছিল থানা লুট, রাজাকার ও পাকবাহিনীদের সঙ্গে যুদ্ধ করে ছিনিয়ে আনা অস্ত্র।

এ শিবিরের অধিনায়ক ছিলেন তৎকালীন ছাত্রনেতা আব্দুল লতিফ মির্জা, পরবর্তীতে এমপি। তার যুদ্ধকালীন ছদ্মনাম ছিল স্বপন কুমার। সহ-অধিনায়ক ছিলেন শ,ম আমজাদ হোসেন মিলন, বর্তমানে এমপি। কমান্ডার ছিলেন আরেক ছাত্রনেতা সোহরাব আলী সরকার, পরবর্তীতে জেলা মুক্তিযোদ্ধা  কমাণ্ডার। তার যুদ্ধকালীন ছদ্মনাম ছিল অশোক বাবু। সহকারী কমান্ডার ছিলেন এ্যাডভোকেট বিমল কুমার দাস। ব্যাটালিয়ন কমান্ডার ছিলেন তৎকালীন বাঙ্গালি সেনা সদস্য লুৎফর রহমান। তার ছদ্মনাম ছিল অরুন। সম্পূর্ণ সামরিক কায়দা কানুনে পরিচালিত এ শিবিরের ৬ টি কোম্পানি ছিল।

পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের সাফল্য :
নওগাঁ যদ্ধঃ ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর সংঘটিত হয় এ যদ্ধ। এটি উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় গেরিলা যুদ্ধ এবং পলাশডাঙ্গা যুবশিবিরের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এই যুদ্ধ জিন্দানী( রহঃ) এর মাজার নওগাঁয় সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর হাতে ১৩০ জন পাকসেনা ও রাজাকার নিহত হয় এবং ১জন পাক আর্মি ক্যাপ্টেনসহ ৯ পাকসেনা জীবিত ধৃত হয়। তাছাড়া এ যুদ্ধে কোন মুক্তিযোদ্ধা নিহত হয়নি।

ভদ্রঘাটের যুদ্ধঃ পাকসেনারা রাজাকারের মাধ্যমে পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের গঠন হওয়ার কথা জেনে ১৯৭১ সালের ১৩ জুন ভোর রাতে ভদ্রঘাট গ্রাম আক্রমন করে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। পরের দিন পাকসেনারা শক্তি বৃদ্ধি করে আবারো আক্রমন করে এবং হারান মাষ্টারের বাড়িসহ প্রায় ২০০ পরিবারের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় ও ১৯ জন নিরিহ মানুসকে হত্যা করে।

ফরিদপুর থানার অস্ত্রলুটঃ পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের প্রথম অপারেশন ছিল ফরিদপুর থানা আক্রমন। ১৯৭১ সালের ৫জুলাই মুক্তিযোদ্ধাদের এ আক্রমনে ওসিসহ ০৫জন নিহত হয় এবং ০৭টি ৩ নট ৩ রাইফেল ও একটি রিভলবার উদ্ধার করা হয়।

এছাড়াও পলাশডাঙ্গা যুব শিবির তাড়াশ, সাথিয়া, গুরুদাসপুর ও চাটমোহর থানার অস্ত্র লুট, কালিয়া হরিপুর ও ঝাওল ব্রীজে রাজাকার অপারেশন, ঘাটিনা ও পাটধারী ব্রীজ উরিয়ে দেওয়ার অপারেশন সফলতার সহিত সম্পন্ন করেন।

মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার, আল শামস, আল বদর ব্যতিত তৎকালীন বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের মুক্তিযোদ্ধারা  জীবনবাজী রেখে মক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন। আর তাদের পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে ভদ্রঘাট গ্রামসহ আশেপাশের লোকজন। স্যলুট জানাই তাদের, যাদের আত্মত্যাগের জন্য আজ আমরা স্বাধীন।

লেখকঃ সাধন বসাক, ভদ্রঘাট, সিরাজগঞ্জ।