র‌্যাবের অভিযানে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে জেএমবির (সারোয়ার-তামীম গ্র“পের) ৩ জন সক্রিয় সদস্য গ্রেফতার

0
2117

আজকের সোনারগাঁওঃ গত এপ্রিল মাস হতে এ পর্যন্ত র‌্যাব-১১ কর্তৃক বেশ কয়েকটি সফল জঙ্গি বিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এ সকল অভিযানে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাসহ ৩৬ জন বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্য ও পলাতক আসামীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বিভিন্ন অভিযানে গ্রেফতারকৃত এ সকল জঙ্গীদেরকে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের নেটওয়ার্ক এবং কার্যক্রমের অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রাপ্ত সে সকল তথ্যাদি যাচাই-বাচাই ও বিশ্লেষণের পর জঙ্গী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত যে সকল সদস্য এখনও গ্রেফতার হয়নি তাদেরকে আইনের আওতায় আনার জন্য অব্যাহতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। র‌্যাব-১১ এর সাম্প্রতিক অভিযান সমূহে গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার আশে পাশের এলাকায় জঙ্গী সংগঠনের সদস্যদের সম্ভাব্য অবস্থান, গোপন মিলনস্থল ও বৈঠকস্থলের সন্ধানে র‌্যাবের গোয়েন্দা নজরদারী আরো বৃদ্ধি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায় যে, নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও এলাকায় একটি জঙ্গী সংগঠনের বেশকিছু সদস্য নাশকতার পরিকল্পনার উদ্দেশ্যে গোপন বৈঠকের জন্য মিলিত হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে র‌্যাব-১১ এর একটি বিশেষ আভিযানিক দল ২১ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ১৯০০ ঘটিকা হতে ২২ আগষ্ট ২০১৭ তারিখের ০৫৩০ ঘটিকা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের বন্দর এবং রুপগঞ্জ থানাধীন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠন জেএমবির (সারোয়ার-তামীম গ্র“পের) ০৩ জন সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। গ্রেফতারকৃত সদস্যরা হলো

আবদুর রহমান@রুবেল@সুফিয়ান (৩২), থানা-কেরানীগঞ্জ, জেলা-ঢাকা। সৈয়দ রায়হানুল আহসান@নাফিস (৩২), থানা-সদর, জেলা-ময়মনসিংহ। মোহাম্মদ ইমাম হোসেন@রাশেদ@রফিক@আবু উমামা আল বাহিরী (২৭), থানা-শাহরাস্তি, জেলা- চাঁদপুর। এ সময় গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে ০১ টি বিদেশী পিস্তল, ০৩ রাউন্ড গুলি, ০১টি চাপাতি, ০১টি চাকু এবং বেশ কিছু জঙ্গীবাদী বই ও লিফলেট উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত সদস্যরা স্বীকার করে যে, তারা নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির (সারোয়ার-তামীম গ্র“পের) সক্রিয় সদস্য এবং তারা সাংগঠনিক কর্মকান্ডের সমন্বয় ও নাশকতার পরিকল্পনার জন্য এই গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিল। আবদুর রহমান@রুবেল@সুফিয়ান (৩২), ২০০১ সালে লালবাগের একটি স্কুল হইতে ৮ম শ্রেনী পাশ করে। এরপর ২০১০ সাল পর্যন্ত সে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকুরীসহ ক্ষুদ্র ব্যবসা করে আসছিল। ২০১০ সালের পর ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরীরর পাশাপাশি বিভিন্ন মাদরাসা ও ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হতে খন্ডকালীন/নৈশ কালীন কোর্সে ভর্তি হয়ে আরবী ভাষার কলা কৌশল রপ্ত করে। ২০১৩ সালে জেএমবির শুরা সদস্য ও শীর্ষ স্থানীয় নেতা ইমরান আহমেদ এর মালিকানাধীন জীম টেক্স নামক পোষাক কারখানায় চাকুরী শুরু করে। অতপর ইমরান আহমেদের অনুপ্রেরণা এবং পৃষ্ঠপোষকতায় চাকুরী হতে ছুটি নিয়ে ২০১৪ সাল হতে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ঢাকার রামপুরা এবং বনশ্রী এলাকায় বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষকের কাছে আরবী শিক্ষা গ্রহণ করে। সর্বশেষ ২০১৭ সালে যাত্রাবাড়ির একটি মাদ্রাসা থেকে আরবীশিক্ষা শেষ করে। সে বেশ কিছুদিন যাবৎ বিভিন্ন বাসায় আরবী পড়ানোর কাজ করছিল বলে জানিয়েছে। সে ২০০২ সালে তানজিম আল ইসলাম নামক মৌলবাদী সংগঠনের মাধ্যমে জিহাদের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং ২০০৪ সালে তার পিতার ঘনিষ্ঠ বন্ধু জনৈক দাউদ এর মাধ্যমে হানাফি মতাদর্শ থেকে সালাফি মতাদর্শে মত্যন্তরিত হয়। ২০০৬ সালে জনৈক এক ‘স্যার’ এর মাধ্যমে সে জেএমবিতে যোগদান করে দাওয়াতী কাজ করতে থাকে। আবদুর রহমান@রুবেল @সুফিয়ান জসিম উদ্দিন রাহমানির জঙ্গী সংক্রান্ত কর্মকান্ডের একান্ত সহকারী হিসেবে প্রায় ০৪ বছর কাজ করেছিল এবং জসিম উদ্দিন রাহমানি গ্রেফতার হওয়ার পর সে মাওলানা আব্দুল হাকিম এর সহকারী হিসেবে প্রায় ০১ বছর কাজ করেছে। মূলত মাওলানা আব্দুল হাকিম গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে ইমরান আহমেদ এর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করে আসছিল। আবদুর রহমান@রুবেল@সুফিয়ান ২০০৬ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ১১ বছর মূল জেএমবির সদস্য হয়ে কাজ করে জেএমবির সদস্য সংগ্রহ করেছে। পরবর্তীতে সে ২০১৬ সালে তার গুরু কথিত ‘স্যার’ এর মাধ্যমে জেএমবির (সারোয়ার-তামীম) গ্র“পে যোগদান করে দাওয়াতী শাখা থেকে সামরিক শাখায় আত্মপ্রকাশ করে। সে ইতিপূর্বে র‌্যাব-১১ কর্তৃক গ্রেফতারকৃত শুরা সদস্য ইমরান আহমেদ এর জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করার কাজ হাতে নিয়েছিল।

সৈয়দ রায়হানুল আহসান@নাফিস(৩২), ২০০০ সালে গাজীপুরের একটি স্কুল হতে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে এসএসসি এবং ২০১৬ সালে ঢাকার একটি সরকারী কলেজ হতে ডিগ্রী পাশ করে। সে ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে সন্ধ্যাকালীন মাষ্টার্স এ অধ্যায়নরত। সৈয়দ রায়হানুল আহসান@নাফিস ২০০৫ সালে তার নিজ জেলা ময়মনসিংহে জেএমবিতে যোগদান করে কাজ করতে থাকে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে ময়মনসিংহ জেলার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারনে সে আত্মগোপনে চলে যায় এবং ঢাকার নিউমার্কেট এলাকায় ছদ¥বেশে আশ্রয় নেয়। সেখানে একটি কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে কাজ করা অবস্থায় অপর জেএমবি সদস্য গ্রেফতারকৃত আব্দুর রহমান@ রুবেল@ সুফিয়ান এর সাথে তার পরিচয় হয়। এরপর আব্দুর রহমানের মাধ্যমে সে জসিম উদ্দিন রাহমানির নিকট যাতায়াত শুরু করে। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে জনৈক ‘স্যার’ এর মাধ্যমে পুনরায় জেএমবিতে সক্রিয় হয় এবং দাওয়াতী কাজ শুরু করে। কম্পিউটারের উপর দক্ষতার কারনে জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের অনেক সদস্যদের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। ২০০৭-২০১৫ সাল পর্যন্ত সে মূল জেএমবির হয়ে ঢাকা অঞ্চলের দাওয়াতী ও সাংগঠনিক কাজ পরিচালনা করত। এর মধ্যে ২০০৭-২০১০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন জেএমবির আমীর মাওলানা সাইদুর রহমান এর নেতৃত্বে কাজ করেছে। ২০১৫ সালের শেষ দিকে সে কথিত ‘স্যার’ এর মাধ্যমে জেএমবির (সারোয়ার-তামীম) গ্র“পে যোগদান করে এবং চাকুরীর অন্তরালে জঙ্গী সংগঠনটির সাংগঠনিক কাজ করতে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে, সে নিজ ঠিকানা গোপন করে বাগেরহাট জেলার ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২০০৮ সাল থেকে অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকুরী করে আসছে। সে দীর্ঘদিন যাবৎ এই চাকুরীর পাশাপাশি মূল জেএমবির ও পরবর্তীতে জেএমবি (সারোয়ার-তামীম) গ্র“পের দাওয়াতী, আইটি এবং গবেষনা শাখার একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করে আসছিল।

-২-

৬। মোহাম্মদ ইমাম হোসেন@ রাশেদ@রফিক@আবু উমামা আল বাহিরী(২৭), ২০০৬ সালে হাজীগঞ্জ পাইলট হাই স্কুল হইতে এসএসসি, ২০০৮ সালে তেজগাঁও কলেজ ঢাকা হইতে এইচএসসি এবং ২০১৫ সালে ঢাকার একটি সনামধন্য বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ঊঊঊ) বিষয়ে øাতক পাশ করে একটি আইটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে থাকে। ২০১৩ সালে জনৈক মোঃ তাওহীদুল ইসলাম@আবু সাদ এর সাথে তার পরিচয় হয় এবং যার মাধ্যমে সে হুজির পক্ষে কিছুদিন দাওয়াতী কাজ করে। পরবর্তীতে জনৈক সাজিদ@ লাল ভাই এর সাথে পরিচয়ের সূত্রে জেএমবির সারোয়ার-তামীম গ্র“পে যোগদান করে। রাশেদ@ আবু উমামা ইতিপূর্বে র‌্যাব-১১ কর্তৃক গ্রেফতারকৃত জেএমবির (সারোয়ার-তামীম গ্র“পের) শরীয়াহ বোর্ডের প্রধান শায়েখ মামুনের সাথে ডেমরার মাদ্রাসায় নিয়মিত সাক্ষাত করত এবং সেখান থেকে হাতে লেখা জঙ্গীবাদী নোট নিয়ে কম্পিউটার কম্পোজ করে দিত বলে স্বীকার করেছে। এছাড়া সে ইতিপূর্বে গ্রেফতারকৃত শুরা সদস্য ইমরান আহমেদের বাসায় প্রায়ই অবস্থান ও গোপন বৈঠক করত এবং জঙ্গী হামলা সংক্রান্ত বিভিন্ন কলা-কৌশল ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে অন্য সদস্যদের মাঝে প্রচারের কাজ করত। রাশেদ ঊঊঊ এর ছাত্র হওয়ার কারনে সংগঠনে তার অনেক গুরুত্ব ছিল। তার বেশ কিছু সহযোগী গ্রেফতার হওয়ার পর গত জুন মাসের প্রথম দিকে সে আত্মগোপনে চলে যায় বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে।

৭। উল্লেখ্য যে, গ্রেফতারকৃত আবদুর রহমান@রুবেল@সুফিয়ান(৩২) এবং মোহাম্মদ ইমাম হোসেন@ রাশেদ@রফিক@আবু উমামা আল বাহিরী(২৭) এর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে দুইটি করে মামলা রয়েছে।

৮। গ্রেফতারকৃত আসামীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ পক্রিয়াধীন।