সোনারগাঁয়ে ছড়িয়ে পরেছে মাদকের ভয়াবহতা নিয়ন্ত্রন সোর্সদের হাতে

0
1366

সোনারগাঁ প্রতিনিধি ঃ সোনারগাঁ উপজেলার হাটে-ঘাটে, অলি-গলিতে পাড়া মহল্লায় বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পরেছে মদক, গাঁজা, ফেনসিডিল, বিয়ার ও ইয়াবাসহ মাদকের ভয়াবহতা। যেকোন সময় হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় মরণ নেশা মাদক। মাদকের ভয়াল থাবায় জড়িয়ে বিপদগামী হয়ে পড়ছে স্কুল কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীসহ যুব সমাজ ও উঠতি বয়সের তরুনরা। বাদপড়ছেননা সম্ভ্রান্ত মুসলি পরিবারের ছেলেরাও। মাদকের করাল গ্রাস থেকে এখনই সোনারগাঁয়ের যুবকদের রক্ষা করতে না পারলে অচিরেই মেরুদন্ডহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন স্থানিয় সচেতন জনগোষ্টি।
মাদক প্রতিরোধে সম্প্রতি স্থানিয় এমপি খোকা, উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশের ভূমিকায় জনমনে অনেকটা আশার আলো জেগেছিল। কিন্তু থানা পুলিশের করা ত্রুটিপূর্ণ ১০ টি ইউনিয়ণ ও একটি পৌরসভার ৫৫৯ জন মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীর নামের তালিকা প্রকাশের ফলে জনমনের আশার আলো নিবু নিবু করছে। সোনারগাঁয়ে মাদক বিক্রির মূল হোতাদের ( মাদক সম্রাট ) সাধারণ মানুষ ও মিডিয়া কর্মীরা চিনলেও পুলিশের তালিকায় তাদের নাম না থাকায় সোনারগাঁবাসী বিস্মিত ও হতাসা প্রকাশ করছেন। মাদকের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকলেও মূল অপরাধী ও নাটের গুরুরা রয়ে যায় ধরা ছোঁয়ার বাহিরে।
মানবাধিকার নেত্রী জাহানারা বেগম বলেন, সোনারগাঁ থানা পুলিশ মাদক ব্যবসায়ীদের যে তালিকা তৈয়ারী করেছে তার মধ্যে ভাল মানুষের নামও রয়েছে।
সনমান্দী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য লুৎফা বেগম বলেন, মারুবদী গ্রামের পাশের বিলে তাবু টানিয়ে প্রকাশ্যে মাদক সেবন ও বিক্রি হচ্ছে।
শম্ভুপুরা এলাকার বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, তার এলাকায় প্রকাশ্যে চলছে ইয়াবা সেবন ও বিক্রি। পুলিশ আটক করার পর আবার উৎকোচ নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে।
সাংবাদিক মাহাবুবুল ইসলাম সুমন বলেন, পুলিশ সাদা পোশাকে সোর্সের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করে। সোর্সরাই ইয়াবা পকেটে ঢুকিয়ে দিয়ে আটক করিয়ে কিছুক্ষন পরে ছাড়িয়ে নেয়।
পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য রুনা বেগম বলেন, শুধু পুরুষ নয় নারীরাও মাদকের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে।
বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সুরাইয়া বেগম বলেন, তার এলাকায় সন্ধ্যার পর পর এক দল যুবক পেয়ারা বাগানে ইয়াবা সেবন করে। পরে রাতের বেলা তারা চুরি, ছিনতাই করে বেড়ায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদকসেবী বলেন, যুবলীগ নেতা আরিফ, ছাত্রলীগ নেতা সজিব, জাতীয়পার্টি নেতা মেম্বার আলমগীর, সন্ত্রসী গিটটু হৃদয় ও তার বোন জামাই রাসেল তারাই হচ্ছে মাদকের বড় ব্যবসায়ী, আপনারা সাংবাদিকরা পারবেন তাদের বিরুদ্ধে নিউজ করতে ? তাদের বালডাও কেউ ছিরতে পারতো না।
সম্প্রতি মাদক প্রতিরোধ রিপোর্টে দেখাযায়, সোনারগাঁ থানা পুলিশের অভিযানে বিগত ২০১৭ সালের আগষ্ট থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত ৮ মাসে উদ্ধার হয়েছে ২৭৭১০ পিস ইয়াবা, ১৪৭২ বোতল ফেনসিডিল, ১৩৫ কেজি গাঁজা, ৩০২ ক্যান বিয়ার, ১৭০ লিটার চোলাই মদ ও ৫ টি বিদেশী পিস্তল। পুলিশ মাদক ব্যবসায় জড়িত ৪৬৮ জনকে গ্রেফতারসহ ভ্রাম্যমান আদালত বসিয়ে আরো ৫৫ জন মাদক ব্যবসায়ীকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করেছেন। এর মধ্যে মূল মাদক চোরাচালানীর ডিলারদের নাম কোথাও নাই ।
মূল মাদক চোরাচালানীরা তাদের নিয়োজিত লোক দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় মাদক দ্রব্য আনা-নেওয়া ও বিক্রির কাজ চালায়। মাদক চোরাচালানে জড়িতদের পুলিশ গ্রেফতার করলেও কিছু দিন যেতে না যেতেই তাদের গডফাদররা আদালত থেকে জামিনে ছাড়িয়ে আনে এবং পুনরায় ঐ একই কাজে বহাল তবিয়তে নিয়োজিত হয় ।
পুলিশ মাদক সেবনকারী ও বিক্রেতাদের গ্রেফতার করলেও রাজনৈতিক প্রভাব এবং মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে মূল মাদক চোরাচালানীর ডিলারদের ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে। পুলিশের এই উৎকোচ বাণিজ্যে সহযোগিতা করে থাকে তাদের নিয়োজিত তথাকথিত সোর্সরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাগেছে ,চট্টগ্রাম, বি-বাড়ীয়া ও কুমিল্লা সীমান্ত পথ দিয়ে ভারত থেকে আসা বিভিন্ন প্রকারের মাদকের চালান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি গোমতি ও মেঘনা সেতু এলাকা এবং ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাঁচপুর ব্রীজ হয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা সদর ও উপজেলা সদর ও রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম সীমান্ত পথ দিয়ে মায়েনমার (বার্মা) থেকে আসা বিভিন্ন মাদকের চালান গুলোও একই ভাবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর ব্রীজ হয়ে চলে যায় রাজধানী ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ সহ আশপাশের জেলা গুলোতে। এভাবে প্রতিদিন মেঘনাঘাট ও কাঁচপুর পয়েন্ট দিয়ে আসছে লাখ লাখ টাকার মাদকের চালান। এর ফলে কাঁচপুর এলাকাসহ সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন পয়েন্ট হয়ে উঠেছে মাদকের স্বর্গরাজ্য।
সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার কাঁচপুর, সোনাপুর, বেহাকৈর, সেনপাড়া, নন্দীপুর মোগরাপাড়া, বন্দেরা, বাড়ী মজলিশ, বাড়ী চিনিস, গোহাট্টা, মেঘনাঘাট, বৈদ্যের বাজার, আনন্দবাজার, আমিনপুর, রাইজদিয়া, গোয়ালদী, ফতেপুর, নয়ামাটি, বালুয়াদীঘিরপাড়, চিলারবাগ, কাইকারটেক, বারদি, তালতলা, জামপুর, নয়াপুর, মারবদী, নাজিরপুর, চেঙ্গাকান্দি, নানাখী, চৌরাপাড়া, ভারগাঁও, লাদুরচর, শেককান্দি, ভিটিপাড়া, লক্ষীবরদী, কলতাপাড়া, বস্তল, হাতুরাপাড়া, মিরের টেক, ভাটিবন্দর, জিয়ানগর, কান্দারগাঁও, মৃধাকান্দি, আষাড়িয়ারচর, পাঁচনী, মঙ্গলেরগাঁও, দুর্গাপ্রসাদ, কাজিরগাঁও, এলাহীনগর, নবীনগরসহ প্রায় অর্ধ শতাধিক স্পটে চলে রমরমা মাদক ব্যবসা।
এ সকল স্পটের খোলা ময়ধানে, কবরোস্থানের পার্শ্বে ও ঈদগাহ এর আসপাশে মদ, গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইন সহ সকল প্রকারের মাদক সন্ধার পর পর বেচা কেনা সুরু হয়। মাদকের এই সহজলভ্যতার কারণে এলাকার স্কুল-কলেজ পড়–য়া ছাত্রদেরকে নিয়ে তাদের অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তার উপর নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাংসদ লিয়াকত হোসেন খোকা বলেন, কমিউনিটি পুলিশের সদস্যরাই মাদকের সঙ্গে জড়িত। পুলিশ এবং কমিউনিটি পুলিশ সঠিকভাবে কাজ করলে মাদক নির্মূল হবে। তাহলে পুলিশের আর কোনো সোর্সের প্রয়োজন হয়না। সকলকে সচেতন হয়ে প্রতিটি সমাজ থেকে মাদক নির্মূল করতে হবে। সোর্সরা নিজেদের এসপি, ডিসি, আইজিপি মনে করেন। মাদকের নিয়ন্ত্রন করে সোর্স। থানার ভাবমূর্তি নষ্ট হয় তদবিরকারীদের জন্য। সম্প্রতি তিনি সোনারগাঁ থানার আয়োজনে ওপেন হাউস ডে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
অনেকে মাদকাসক্ত হয়ে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে মাদকের টাকা জোগাড় করতে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই সহ নানা প্রকার অপরাধ, অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে। তাই এলাকার যুব সমাজকে এই মরন নেশা থেকে মুক্ত করার জন্য প্রশাসনকে এ ব্যাপারে আরও তৎপরতা বাড়ানোর জন্যে আহবান জানান মাদকাসক্ত তরুন যুবকদের অভিভাবক ও সচেতন মহল।
এছাড়া বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গুলোকে মাদক বিরোধী প্রচার-প্রচারণা, সভা, সেমিনার ইত্যাদির মাধ্যমে মাদকের কুফল সম্পর্কে এলাকাবাসীকে সচেতন করে তুললে মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসন থেকে যুব সমাজকে বিরত রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল।
সোনারগাঁ থানার (ওসি) মোরশেদ আলম জানান, ইতোমধ্যেই অনেক মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ এবং তাদের মাদক স্পটগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে পুলিশ ব্যবস্থা নিলেও আদালত থেকে তারা সহজেই জামিন পেয়ে পুনরায় একই পেশায় নিয়োজিত হয়। স্থানীয় এলাকাবাসী ও অভিভাবকরা সচেতন হলে এবং থানা পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলেই মাদকের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের কঠোরভাবে দমন করে মাদক প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে ।